অর্থনৈতিক দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে ইউরোপে বড় কোম্পানিগুলো বেশ দুরবস্থায় রয়েছে। এতে গত কয়েক বছরে তাদের বাজারমূল্য পড়তির দিকে রয়েছে, যার সুফল নিতে প্রাইভেট ইকুইটি (পিই) গ্রুপগুলো ২০২৪ সালে ইউরোপে কার্যক্রম বাড়িয়েছে এবং কম দামে বড় বড় কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, একাধিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু হওয়া ২০২৫ সালেও সে প্রবণতা বজায় থাকবে।
আর্থিক বাজারবিষয়ক প্লাটফর্ম ডিলজিকের ডেটা বিশ্লেষণ করে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস দেখিয়েছে, ইউরোপে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের বাইআউট ডিলের পরিমাণ বাকি বিশ্বের তুলনায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।
২০২৪ সালে এ মহাদেশে সম্পন্ন হওয়া বড় চুক্তির মূল্য ছিল ১৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি। বিপরীত দিকে বিশ্বের অন্যান্য অংশে এ ধরনের চুক্তি বাড়ার হার ছিল ২৯ শতাংশ, যার মূল্য ২৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এ তথ্য ইঙ্গিত দেয়, প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলো ইউরোপের কম বাজারমূল্যের কোম্পানিগুলোর ওপর নজর দিয়েছে।
এসব চুক্তির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিনিয়োগ প্লাটফর্ম হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের জন্য ৬৯০ কোটি ডলারের কনসোর্টিয়াম চুক্তি। যুক্তরাজ্যের বেসরকারি সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ডার্কট্রেসকে অধিগ্রহণে ৫৫০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে মার্কিন পিই কোম্পানি থোমা ব্রাভো। এছাড়া ফরাসি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা নিওয়েনের জন্য ৩৮০ কোটি ডলারের অংশীদারত্ব চুক্তিতে যেতে সম্মত হয়েছে ব্রুকফিল্ডসহ একাধিক সংস্থা।
মূলত অর্থনৈতিক সংকট ইউরোপে প্রাইভেট ইকুইটি ডিল বাড়িয়েছে। আইনি সংস্থা ক্লিফোর্ড চ্যান্সের অংশীদার নিল বার্লোর মতে, মন্থর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক হুমকিসহ চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান দেশটির পিই সংস্থাকে ইউরোপের নির্দিষ্ট কিছু দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে।
তিনি আরো জানান, ইউরোপের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কিছু নির্দিষ্ট দেশ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশের কারণে প্রাইভেট ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, নর্ডিক অঞ্চল ও জার্মানি। এখানকার তুলনামূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা নিশ্চিতে সুযোগ দেয়।
এ প্রক্রিয়ার মাঝে ইউরোপীয় স্টক এক্সচেঞ্জগুলো, বিশেষত লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ সংকটে পড়ছে। কারণ অনেক কোম্পানি ইউরোপ থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বাইআউট ফার্মের সহায়তায় প্রাইভেট হচ্ছে।
ডিলজিক ডেটা অনুসারে, ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যমানের মেজরিটি স্টেকসহ ইউরোপীয় টেক-প্রাইভেট ডিলসের মূল্য গত বছর ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার হয়েছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের ১০টি চুক্তি নথিবদ্ধ হয়েছে, যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ১৫টি। টেক-প্রাইভেট ডিলস এমন চুক্তি বোঝায়, যেখানে একটি পাবলিক কোম্পানিকে প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম বা অন্য কোনো বেসরকারি বিনিয়োগকারী গ্রুপ অধিগ্রহণ করে, যার ফলে কোম্পানিটি আর শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত থাকে না।
বাজারমূল্যের দিক থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গত এক দশক ধরে ইউরোপীয় ইকুইটির মূল্যমান যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম ছিল। সম্প্রতি এ ব্যবধান আরো বেড়েছে এবং স্টক্সক্স ইউরোপ ৬০০ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর তুলনায় রেকর্ড ছাড়ে লেনদেন করছে।
অবশ্য ২০২৪ সালে বড় বাইআউট ডিলের মোট মূল্যের তুলনায় টেক-প্রাইভেট ডিলের অনুপাত কম ছিল। কিছু বড় লেনদেন দেখা গেছে, যেখানে মালিকানা ভিন্ন প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মের মধ্যে স্থানান্তর হয়েছে বা প্রাইভেট ক্যাপিটাল মালিকদের কনসোর্টিয়ামের গঠন পরিবর্তন হয়েছে।
ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের বাইআউট ফার্ম বিসি পার্টনার্স থেকে ডাচ ওষুধ প্রস্তুতকারক সিনথন কিনতে ২০০ কোটি ইউরোর বেশি মূল্যের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করেছে গোল্ডম্যান স্যাকস। এর আগে স্কুল ব্যবসা নর্ড অ্যাংলিয়ার স্টেক বিক্রয়ের জন্য বিনিয়োগকারীদের একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার মূল্যের চুক্তি করেছে সুইডিশ বাইআউট গ্রুপ ইকিউটি। এখানে ইকিউটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
বড় চুক্তির এ বড়বাড়ন্তের মাঝে ছোট বাইআউটের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে ইউরোপ। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপে ৫-১০০ কোটি ডলারের বাইআউট ডিল ২০২৪ সালে মাত্র ১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে বাকি বিশ্বে এ হার ছিল ১৬ শতাংশ।
বিনিয়োগবিষয়ক মার্কিন পরামর্শক সংস্থা হ্যামিল্টন লেনের কর্মকর্তা রিচার্ড হোপ বলেন, ‘এটি কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে ইউরোপ ছোট চুক্তির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে।’
জানা যাচ্ছে, ইউরোপের বাইআউট বাজারের বড় অংশ ১০০ কোটি ইউরোর নিচে ছোট কোম্পানি অধিগ্রহণকেন্দ্রিক। তবে মূল্যস্ফীতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছোট বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোর জন্য এখানে বিনিয়োগ কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিসি পার্টনার্সের আলেক্সিস মাস্কেলের মতে, ইউরোপের বাইআউট মার্কেট ‘খুবই খণ্ডিত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের চুক্তি, কিন্তু এ মূল্যে তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিচিত কোম্পানি পাওয়া সম্ভব’, এসব চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম খরচ করতে হয়। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে নেতৃত্ব দেয়া কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষের তুলনায় সস্তা হতে পারে। এ সুযোগ লুফে নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে মার্কিন সংস্থাগুলো।